Thursday, January 7, 2021

নিমাই-তোতাই

 তাহাদের ছোট 'মন'

থাকে প্রতীক্ষায়-

এই বুঝি এ'রে-অ'রে 

জাপটে ধরা যায়।


সুঁচাগ্র ভ্রম যদি ধরে আঁখি-পটে

'চার-হস্ত' এক করি নাচিয়া-কুদিয়া মরে-

ভাতেরে আজ অন্ন ক'ওয়া হে'ন লোক ভাই

অতীত ভুলিয়া গিয়া 'ইয়া' চোখে চায়।


অর্থ-প্রাপ্তি দেয়নি তা'দের মনো-বুদ্ধি'র প্রসারতা

নিজ ভূবণ রচিয়া নিজেই সাজে রাজা

মান-সম্মান স'বি তা'রা অর্থে প্রাপ্তি দেখে

ভাবিতেছে হে'ন মহৎপ্রাণ(!) নাই এ'রাজ্যে।


এ'সব অর্বাচীনের ভীড়ে 'নিমাই-তোতাই'

চোখ বুজে প্রশ্ন ভাবে-

পালাবার পথ নাই???

Post Comment

তরী

 জপিলাম মালা তাঁহারে স্মরিয়া 

গাঁথিলাম কাঁটা কন্ঠে

নয়ন বুজিয়া ভজিলাম নাম

তুলিলাম সুর ছন্দে।


আপন ভাবিয়া আপন হস্তে

লইলাম চরণ ধূলা

চন্দন আর পুষ্প ছিটাইয়া

সাজাইলাম প্রেমের ভেলা।


গম্ভীর মুখে পানসা চাহনি

বীণায় নাহি উঠে সুর

ভাবনার জগতে কিয়ৎ ভাবিয়া

দৃষ্টি ফেলিলেন বহু দূর।


ইহাতে সূচনা নব উল্লাস

রথযাত্রার তান

জমিয়া উঠিল মহা উৎসব

দাঁড় টানিয়া গাহিলাম গান।


তরী ভাসিল মাঝ দরিয়ায়

মাঝির জয়গান

এতোদিনের আরাধনা 

পাইলো পূর্ণ প্রাণ। 


ধূপ দীপ আর নৈবদ্য ঘ্রাণে 

মৌ মৌ করিছে তট

তাঁহার ভজনে দুই হাত তুলিয়া

মানিয়া নিয়াছি বট।


তাঁহার কথা লোকমুখে যবে 

ছড়াইল সারা বেলা

বুঝিলেন তিনি পাইয়া গিয়াছেন

যশ-খ্যাতি-প্রেম মেলা।


নতুন ফুলের পূজা পাইতে

মন তাঁহার হইলো ব্যাকুল

একূল ছাড়িয়া ডিঙা ভাসাইয়া

চলিলেন অন্য কূল।


চোখের জলেতে হৃদয়ের টানে

নাহি দিলেন তিনি সাড়া

অন্য মুখের জপ নাম শুনিতে

হইলো ভীষণ তাড়া।


নব তরীতে নব সুর মাখিয়া

ধরিবেন নতুন গান

তুষ্ট হইলে সে তরী ছাড়ি

আবার তুলিবেন পাল।


নব নব পুষ্প ধূপ দীপ পাইয়া

রহিবেন তিনি সুখে

তাহার প্রেমে ভাসিলো যারা

ভাসিলো কুলহীন দুখে।


এই করিয়া তাঁহারা আজীবন 

বিজয়ের গান গায়

অন্যের মুখের ভজন হইয়া

অন্যরে ছাড়িয়া যায়।।


তরী

প্রবাল ভৌমিক

Post Comment

যন্ত্র-মানব

 'যন্ত্র-মানব' এর পক্ষে অনেক কিছুই করা সম্ভব, যা মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। সময়ের প্রয়োজনে মানুষ এখন যান্ত্রিক হচ্ছে, জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে মানুষের চিন্তা চেতনা। এ পরিবর্তন রোধ করা আপাতদৃষ্টিতে সম্ভব নয়। তবে প্রকৃতি চাইলে তার আপন ক্ষমতাবলে শুধুমাত্র মানুষ নয় সমগ্র সৃষ্টিকে তার নিজের মতো করে পুনরায় সাজিয়ে তুলতে পারে। সেটা ভিন্ন ব্যাপার। কিন্তু মানুষ সহজাত ভাবেই কখনো পিছনে ফিরে যেতে চায় না। বিরতিহীন এগিয়ে যাওয়াই মানব সন্তানের ধর্ম। এই এগিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রতিটি ধাপে প্রতিনিয়ত ঘটছে পরিবর্তন। 


যান্ত্রিক হওয়া বলতে শুধুমাত্র যন্ত্র নির্ভর হওয়াকেই বোঝানো হয় না। প্রকৃতির কোমল স্পর্শ এড়িয়ে যন্ত্র নির্ভর হওয়ার পাশাপাশি মানবিকতা হারানোকে এক কথায় যান্ত্রিকতা বলা যেতে পারে। ক্রমাগত পরিবর্তনের ধারায় মানুষ যন্ত্র নির্ভর হতেই পারে কিন্তু তার সাথে মানবিকতা কেন হারাবে? উত্তরটা এমন হতে পারে, আদিমকাল থেকেই প্রাকৃতিকভাবে মানুষের মাঝে দুটো বোধ কাজ করে বলে ধারণা করা হয়- ভালো বোধ ও খারাপ বোধ। ভালো বোধের চেয়ে খারাপ বোধই মানুষের মাঝে বেশি সক্রিয় থাকে। পরিবর্তনের সাথে সাথে এ দুটি বোধও পরিবর্তিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই 'দূর্বল' ভালো বোধ বেড়েছে গানিতিক হারে অন্যদিকে 'শক্তিশালী' খারাপ বোধ বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। ফলাফলে খারাপ বোধের চাপায় অতল গহবরে হাবুডুবু খাচ্ছে ভালো বোধ। ফলে মানুষ হারিয়েছে তার মানবিকতা। 


বাংলাদেশের 'এনটিভি' টিভি চ্যানেলের সূচনা লগ্নে উক্ত চ্যানেলের মূল স্লোগান প্রনয়ণের দায়িত্ব পড়ে প্রখ্যাত টিভি উপস্থাপক জনাব হানিফ সংকেত এর উপর। এনটিভি'র "সময়ের সাথে আগামীর পথে" স্লোগানটি প্রনয়ণ করে হানিফ সংকেত বলেছিলেন, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে না পারাটা আমাদের ব্যার্থতা। অর্থাৎ সময়ের সাথে আমাদের পরিবর্তিত হতেই হবে। আমরাও তাই হচ্ছি। তাহলে গোলটা কোথায়? অবশ্যম্ভাবী এই পরিবর্তনের ধারায় এগিয়ে যেতে যেতে মানবিকতা হারা কেন হচ্ছি আমরা? কেন ভালো বোধগুলো আমাদের খারাপ বোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না? পরিবর্তনকে আমরা অস্বীকার করতে পারবো না, সাথে সাথে অমানবিক হওয়াও কি আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক? 


আমরা কথায় কথায়ই বলি, হাতি নিজের শরীর দেখে না। হাতিদের হাসি আমরা বুঝি না। তা নাহলে আমাদের এমন কথা শুনে তাদের অট্ট হাসিতে হয়তো আমরা লজ্জিত হতাম। আসলে মানুষই তার নিজের শরীর দেখে না অর্থাৎ নিজের কপটতা, নিজের চরিত্রহীনতা, নিজের দূর্বলতা- এসব মানুষের নজড় এড়িয়ে যায়। তারা সবসময় অন্যের অনুশীলনে তৃপ্তি বোধ করে, অন্যের সমালোচনায় মনে পাশবিক আনন্দ অনুভব করে, অন্যের ত্রুটি অন্বেষণে সবসময় সচেষ্ট থাকে। এতো কিছুর মাঝে নিজের দিকে নজড় দেওয়ার সময় কোথায়! এর ফলে সে নিজের বিবেক'কে জাগ্রত করতে পারে না। বিবেক মানুষের মনের এন্টিবডি, যা খারাপ বোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এতে করে অমানবিক হওয়ার পথে আর কোন বাধাই থাকে না।


রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, দূরে থাকার আনন্দই হলো চিঠি। আজকের দিনে চিঠির জায়গা দখল করেছে এসএমএস, ই-মেইল ইত্যাদি। এতে দোষের কি আছে? কবি গুরুর জীবদ্দশায় এসব আবিষ্কার হলে তিনিও নিশ্চয়ই এ পরিবর্তন মেনে নিতে দ্বিধা করতেন না। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বস্তুগত যন্ত্রের উপর নির্ভরশীলতা স্বাভাবিক। কিন্তু মানসিক যান্ত্রিকতা কি গ্রহণযোগ্য?

Post Comment

কেন বিনয়ী হবেন (না)

 কেন বিনয়ী হবেন (না)


বিনয় একটি মহান গুন। বলা হয়ে থাকে, বিদ্যা বিনয় দান করে। যারা বিনয়ী তারা জীবনে সফলতার চরম উৎকর্ষ লাভ করেন বলেও অনেকের ধারণা। অভিধানিকভাবে বিনয়ের অর্থ মিনতি, নম্রতা, শিক্ষা। সমাজ পরিবর্তনশীল। পরিবর্তিত সমাজের স্রোতধারায় অনেক ক্ষেত্রেই পরিবর্তন লক্ষিত হয়, অনেক তত্ত্বই ভুল প্রমাণিত হয়, অনেক অগ্রহণযোগ্য ব্যাপার গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে আবার কিছু কিছু ব্যাপার সগৌরবে নিজ স্থান দখল করে থাকে। সময় ও সমাজের পরিবর্তনের সাথে সাথে বিনয় নিয়েও নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে কিনা জানি না। নিচে কেন আমরা বিনয়ী হবো (না), বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা হল।


বিনয়ী হলে আপনি ভদ্র হবেন। 

কিন্তু আপনার ভদ্রতার জন্য আপনি কোথাও মূল্যায়িত হবেন না। বরং আপনাকে দূর্বল ভাবা হবে। প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার পাশাপাশি কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হবে।


বিনয়ী হলে আপনি সত্যবাদী ও ন্যায়পরায়ণ হবেন।

কিন্তু বর্তমান সমাজে এসব সদাচরণের কোন মূল্যায়ন নেই। বরং আপনাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করা হবে। আপনাকে অকর্মণ্য ভাবার পাশাপাশি সমাজে অচল 'মাল' হিসেবে গণ্য করা হবে।


বিনয়ী হলে আপনি নিচু গলায় কথা বলবেন।

কিন্তু ব্যাপারটা অনেকেই ইতিবাচকভাবে নেবে না। বরং আপনাকে 'কম-জোর' মনে করা হবে। কাপুরুষ মনে করার পাশাপাশি আপনার কথা বলার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে।


বিনয়ী হলে আপনি গুরুজনদের সামনে মাথা নিচু করে কথা বলবেন।

কিন্তু আপনার এ বিনয় সঠিক ব্যাখ্যা পাবে না। বরং আপনাকে ভীতু মনে করা হবে। দূর্বল চিত্তের অধিকারী ভাবার পাশাপাশি আপনাকে উচিত কথা বলতে না পারার লোক হিসেবে আখ্যা দেয়া হবে। 


বিনয়ী হলে আপনি অন্যের মতামতকে গুরুত্ব দিবেন। 

কিন্তু এতে আপনার মূল্যায়ন বাড়বে না। বরং আপনি বিতর্কিত হবেন। সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম এমন অভিযোগের পাশাপাশি আপনার উপর অযৌক্তিক মতামত চাপিয়ে দেওয়া হবে।


বিনয়ী হলে আপনি অন্যকে সম্মান করবেন। 

কিন্তু আপনি সম্মানিত হবেন না। বরং আপনাকে অসহায় ভাবা হবে। অতি ভক্তি প্রদর্শনের অভিযোগের পাশাপাশি কোন উদ্দেশ্য হাসিলের পাঁয়তারা করছেন ভেবে আপনার প্রতি সবাই বাঁকা চোখে তাকাবে।


বিনয়ী হলে আপনি নিরহংকারী হবেন।

কিন্তু আপনি এর প্রতিদান পাবেন না। বরং আপনাকে অযোগ্য মনে করা হবে। আপনার কোন গুন নেই, এমন ভাবার পাশাপাশি আপনাকে অজ্ঞানী ভাবা হবে।


বিনয়ী হলে আপনি কাউকে হেয় করবেন না।

কিন্তু এটা যে একটা বিনয় তা কেউ ভাববে না। বরং আপনাকে হেয় প্রতিপন্ন করা হবে। আপনাকে গুরুত্বহীন ভাবার পাশাপাশি উচিত কথা বলতে না পারার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হবে। 


বিনয়ী হলে আপনি নিঃসংকোচে ভুল স্বীকার করবেন।

কিন্তু আপনি প্রশংসিত হবেন না। বরং আপনাকে দূর্বল চিত্তের অধিকারী ভাবা হবে। অকর্মণ্য ভাবার পাশাপাশি আপনাকে বর্তমান সমাজে অনুপযুক্ত ভাবা হবে। 


বিনয়ী হলে আপনি মানুষের উপকার করতে চাইবেন ও কৃতজ্ঞ হবেন। 

কিন্তু প্রয়োজনে আপনি কাউকে পাশে পাবেন না। বরং আপনি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হবেন। পেছনে আপনার বদনাম করার পাশাপাশি আপনাকে গালাগাল করতেও অনেকে দ্বিধা করবে না।


বিনয়ী হলে আপনি আইনকে শ্রদ্ধা করবেন।

কিন্তু আপনি মূল্যায়িত হবেন না। বরং আপনার প্রতি সবাই বিস্ময় ও বিরক্তি প্রকাশ করবে। যথাযথ বাঙালি হতে পারেননি, এমন অভিযোগের পাশাপাশি আপনাকে ন্যাকামো'র দায়ে দন্ড প্রদান করা হবে।


এখন সিদ্ধান্ত আপনার। আশাকরি আপনি বিনয়ী হবেন (না)।

Post Comment

অতৃপ্ত বাসনা

 অতৃপ্ত বাসনা


ছেলের নাম আবদুর রহমান। সবাই রহমান নামেই ডাকে। কিন্তু মা হোসনেয়ারা বেগম কখনো তাকে রহমান নামে ডাকেন না, তিনি সবসময় ছেলেকে আবদুর রহমান নামেই ডাকেন। এক কন্যা সন্তানের পর হোসেন চৌধুরী ও হোসনেয়ারা বেগমের কোল জুড়ে আসে আবদুর রহমান। হোসনেয়ারা বেগম বেশি ভালোবাসেন ছেলেকে। ছোটবেলা থেকে এক পলকের জন্য ছেলেকে চোখের আড়াল করতে তিনি নারাজ। 


আবদুর রহমানের বয়স এখন চার বছর। বর্তমানে তারা তিন ভাই, তিন বোন। সংসারে বেশ কয়েকজন নতুন অতিথির আগমন স্বত্তেও রহমান এখনো তার মায়ের কাছে সেই আদরের আবদুর রহমান। মা স্বভাবতই সকল সন্তানের প্রতি তাঁর স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা সমানভাবে বিলিয়ে দিয়েছেন কিন্তু আবদুর রহমানের স্থানটি অন্য কোন ভাই বোন দখল করতে পারেনি। রহমান তার মায়ের কাছে কাছেই থাকে। মায়ের কোলে মাথা রেখে প্রতিদিনই মায়ের অকৃত্রিম স্নেহ-ভালোবাসায় ধন্য হয় সে। অন্যান্য ভাইবোনরা মাঝেমধ্যে মায়ের বকুনি খেলেও হোসনেয়ারা বেগম কখনো আবদুর রহমানের প্রতি কঠোর হতে পারেন না। এক শীতল, স্বর্গীয়, গভীর অনুভূতি নিয়ে তিনি তাকান রহমানের দিকে৷ 


হোসেন চৌধুরী সাহেব বংশধর মানুষ। গঞ্জে বড় ব্যবসা সাথে ক্ষেতখামার। হোসেন সাহেবের দুটো শখ; টাকা উপার্জন ও নিজের বংশবৃদ্ধি। প্রতি বছর ব্যবসায় বড় অংকের লাভের পাশাপাশি একটা করে নতুন সন্তানের মুখ না দেখলেই নয়। বংশরক্ষাই বিয়ের একমাত্র উদ্দেশ্য বলে হোসেন সাহেবের দৃঢ় বিশ্বাস। বিয়ের ছয় বছরের মাথায় ব্যবসার লাভের টাকায় তিন কানি সম্পদ কিনার পাশাপাশি হোসনেয়ারা'র কোলে ছয়টি ফুটফুটে সন্তান তুলে দিতে পেরে হোসেন সাহেব অত্যন্ত গর্বিত। অন্যদিকে চৌদ্দ বছর বয়সে হোসেন সাহেবের বউ হয়ে এ বাড়িতে আসা হোসনেয়ারা বেগম প্রতি বছর বছর স্বামীর মুখে হাসি ফোটাতে ফোটাতে আজও ঠোঁটের কোনে মুচকি হাসার বৃথা চেষ্টা করেন। কুড়ি বছর বয়সী হোসনেয়ারা বেগমকে ইদানীং চল্লিশোর্ধ্বই মনে হয়। তবে তিনি মন খারাপ করেন না। চৌধুরী বাড়িতে বিয়ে হয়েছে এটাই তো তাঁর সাত কপালের ভাগ্য! যখন খুব বেশি মন খারাপ হয় আবদুর রহমানকে কোলে নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি গুনগুন করে গান করেন। মন ভালো হয়ে যায়।


বছরখানেক পরের কথা। একদিন ভোরবেলা প্রচন্ড শোরগোলের মধ্যে আবদুর রহমানের ঘুম ভাঙে। বাড়িতে অনেক মানুষের সমাগম দেখতে পেয়ে চোখ ডলতে ডলতে রহমান ঘর থেকে বেরিয়ে এসে উঠোনে একটা পাটিতে তার মাকে শুয়ে থাকতে দেখে। পরিবারের সদস্য ও নিকট আত্মীয়রা রহমানের মাকে ঘিরে বিলাপ করছেন। হোসেন সাহেব একপাশে দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছছেন। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ মায়ের বুকে মাথা গুঁজে মাকে জড়িয়ে ধরে থাকা রহমানের দীর্ঘদিনের অভ্যাস, মাও তাকে পরম মমতায় দু'হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে চুমু খান। মায়ের আদরের আবদুর রহমান কারো দিকে তেমন লক্ষ্য না করে উঠোনে পাতা পাটিতে শুয়ে থাকা মায়ের বুকে মাথা গুঁজে দিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলো। চারদিকের বিলাপের ধ্বনি উচ্চ হলো। হোসেন সাহেব সশব্দে হাউমাউ করে উঠলেন। কিন্তু আজ আর মমতাময়ী মা চোখ খুললেন না, দু'হাতে জড়িয়ে ধরলেন না তাঁর প্রিয় সন্তান আবদুর রহমানকে।


আবদুর রহমান কি কখনো জানবে তার বাবার বংশের সপ্তম প্রদীপ জ্বালতে গিয়ে মাত্র একুশ বছর বয়সে নিজেই চিরতরে নিভে গেলেন তার মমতাময়ী মা?

Post Comment

বাংলাদেশের এক প্রান্তের একটি ছোট গল্প

 সন্ধ্যা প্রায় সাতটা। আষাঢ়ে বৃষ্টি হচ্ছে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া রায়হান সুর করে পড়ছে- আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ। এটি একটি ছোট  কিন্তু জনবহুল দেশ................। মিসেস ফরিদ রান্নার জোগাড় করছেন; পাশাপাশি ফুটো হয়ে যাওয়া টিনের চালের যেসব অংশ দিয়ে ঘরে পানি পড়ছে সেখানে কিছু পাতিল বসিয়ে দিচ্ছেন। ফরিদ সাহেব বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে ধূমপান করতে করতে ভাবছেন।

- কতবার বললাম বৃষ্টির দিন আসছে, একজন মানুষ এনে টিনের চালটা মেরামত করার জন্য। কত জায়গায় আর পাতিল বসাব, পাতিল সব শেষ হবার অবস্থা। এভাবে ঘরে থাকা যায়?

স্ত্রীর কথা শুনে ফরিদ সাহেব শেষ টান দিয়ে সিগারেটটা উঠোনে ফেললেন।

- রফিককে বলেছিলাম, সে তো আসলো না। দেখি কাল একবার যাব ওদিকে।

রায়হান একটু থেমে মা বাবার কথা শুনে আবার পড়া শুরু করলো- আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ। এটি একটি ছোট  কিন্তু জনবহুল দেশ................।


পরেরদিন ফরিদ সাহেব নিজের সাথে করে রফিক মিস্ত্রিকে নিয়ে আসলেন। রফিক টিনের চালে উঠে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলো।

- টিন তো কাকা সব গেছে। এখন আপাততঃ পুটিং লাগিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু টিন পাল্টাতে হবে। কমপক্ষে ছয়টা টিন লাগবেই। 

ফরিদ সাহেবের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো। এই মুহূর্তে এতো টাকা জোগাড় করা কষ্টসাধ্য। 

- আচ্ছা, এখন পুটিং লাগিয়ে দাও। আমি টিন এনে তোমাকে খবর দিব।

- জ্বী কাকা।

রায়হান ছাতা মাথায় উঠোনে দৌড়াদৌড়ি করতে দিয়ে পা পিছলে পড়ে গেল। মিসেস ফরিদ ছুটে গেলেন।

- এ ছেলে আমাকে শান্তি দিবে না।

- কেটেছে কিনা দেখ। কাটলে একটু স্যাভলন দিয়ে ধুয়ে মলম লাগিয়ে দাও।


ফরিদ সাহেব বেতন পাবেন আরো বারো দিন পর। অল্প বেতনের চাকুরী করেন। সংসারে টানাপোড়ন লেগেই থাকে। চালের টিনগুলো অনেক আগেই পাল্টাবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু সংসারের ব্যয় নির্বাহ করে, রায়হানের লেখাপড়ার খরচ নির্বাহ করে মাস শেষে হাতে আর কিছুই থাকেনা। কিন্তু এবার যেভাবেই হোক টিনগুলো পাল্টাতে হবে। ঘরে বৃষ্টি হলেই যে পরিমাণ পানি পড়ে তাতে কয়েকদিন পর ঘরে থাকাই দুস্কর হয়ে যাবে। 


মাস শেষে বেতনের টাকা তুলে মুদি দোকান, সবজি দোকানের দেনা শোধ করে এবং কিছু মাছ-মাংস কেনার পর যে পরিমাণ টাকা অবশিষ্ট রইলো তাতে টেনেটুনে ছয়টা টিন কেনা যেতে পারে কিন্তু হাতে আর অবশিষ্ট কিছুই থাকবে না। ফরিদ সাহেব টিনের দোকানে গিয়ে দুটি টিন কিনে এনে ঘরে রাখলেন। পরের দু'মাসে দুটি করে আরো চারটি টিন কিনে রাফিককে ডেকে এনে কাজ করাবেন।


- আর পারি না। চালের উপর লক্ষ লক্ষ ছিদ্র হয়ে আছে। কত জায়গায় পাতিল বসানো যায়। ছয়টা টিন কিনতে কিনতে বৃষ্টির দিনই শেষ হবে। রান্না করতে করতে অর্ধেক ভিজে গেলাম। খাটের উপরও পানি পড়তে শুরু করেছে। 

- খাটটা একপাশে সরিয়ে নিতে হবে। আগামী মাসে আরেকটু সাশ্রয় করে চারটা টিন কেনা যায় কিনা দেখবো। মাস শেষ হোক।


রায়হান একটু থেমে মা বাবার কথা শুনে আবার পড়া শুরু করলো- আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ। এটি একটি ছোট  কিন্তু জনবহুল ও দরিদ্র দেশ................।


> বাংলাদেশের এক প্রান্তের একটি ছোট গল্প 

> প্রবাল ভৌমিক

> জুন'২০২০

Post Comment

নষ্ট সমাজ

 কয়েকদিন আগে রাস্তায় একজনকে দেখতে পাই। একা নয়; পুরনো বন্ধুরা সব সাথেই ছিল। মাঝ রাস্তায় অট্টহাসি সমেত সরব - সমবেত উৎফুল্লতা। কোন পরিবর্তন চোখে পড়েনি। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। একেবারে কাছাকাছি এসে নিশ্চিত হয়ে চোখদুটো নিচের দিকে নামিয়ে চলে গেলাম। এর কিছুদিন পরই দেখতে পাই দ্বিতীয়জনকে। সে শার্টের উপরের দিকের দুটি বোতাম খুলে দিয়ে বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। রীতিমতো নিজের চোখের উপর অবিশ্বাস হলো। কিন্তু খুব কাছে আসতেই আমার অবাক নয়নে নয়ন রেখে সে যখন আমার কুশলাদি জানার আগ্রহে মুখ খুলছিল, তখনই অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে সোজা হেঁটে চলে গেলাম। 


যেদিন গণধর্ষণের কথাটা কাগজে পড়ি, সেদিনই দুজনকে চিনতে পেরেছিলাম। বাচ্চা ছেলে দুজনই। ভয়াবহতা হচ্ছে, মেয়েটিকে ব্ল্যাকমেইল করে মাসের পর মাস দুজন মিলে ইচ্ছেমতো ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে যাচ্ছিল। একপর্যায়ে প্রশাসনের সহযোগিতায় দুজনই হাতেনাতে ধরা পড়েছিল। মামলা হলো, দুজনই হাজতবাসী হলো; আমরা মনে মনে শান্তি পেলাম।


এ ঘটনার আগে তারা পনের-বিশ জনের সংঘবদ্ধ গ্রুপ হয়ে চলাফেরা করতো। উল্লেখিত দুজনের একজন ছিল ওই গ্রুপের মূল নেতা। ইভটিজিং ছিল এই গ্রুপের প্রতিটি সদস্যের নেশা। সকাল, দুপুর, বিকাল, এমনকি রাত দশটার পরেও তাদের বাজারে দেখা যেত। ধারণা করি, তাদের মা-বাবা তাদেরকে ভায় পায়। তাই তাদের উপর কোন পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ নেই। তারা কতিপয় তথাকথিত বড় ভাইয়ের ঢাল হিসেবে তাদের আশ্রয়ে লালিত-পালিত হচ্ছিল। এককথায়, এক এক জন বাজারের রংবাজ হিসেবেই গড়ে উঠছিল; যারা ধরাকে সরা জ্ঞান করতে অভ্যস্ত ছিল না। 


গণধর্ষণ মামলায় গ্রুপের দুই সদস্য গ্রেপ্তার হওয়ার পর পুরো গ্রুপের দৌরাত্ম্য লক্ষনীয়ভাবে কমে এসেছিল। ভেতরে ভেতরে আঁচ করতে পারছিলাম, সেই বড় ভাইরা আরো উপরের বড়ভাইদের সহযোগিতা নিয়ে এই দুই ধর্ষকের জামিন করানোর জন্য নীরবে কাজ করে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ফলাফল এলো; জামিন হলো। তারা হাজত থেকে বের হয়ে আবার গ্রুপ চাঙা করা শুরু করেছে, দ্বিধাহীনভাবে বুকচেতিয়ে সদলবলে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। যে সাংগঠনিক সাইনবোর্ড তারা ব্যবহার করছে, সেই সংগঠনের এমন কোন সুবিবেচক-বোধসম্পন্ন কান্ডারী নেই, যিনি অন্ততঃ এই দুজনের ঘরে থাকা নিশ্চিত করতে পারেন? যারা জামিন করাতে পেছন থেকে নীরবে কাজ করেছেন,তারা? আমি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে তাদের এড়িয়ে চলছি, তাদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করছি; এটাই আমার প্রতিবাদ। কিন্তু আমাদের সমাজে সমাজপতি রয়েছেন, বর্তমান সময়ের অনেক হিট বড়ভাই রয়েছেন, সাংগঠনিক কান্ডারী রয়েছেন; তাদের তো আরো কিছু করার আছে। কেন তাঁরা দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন? এমন বেহায়াপনা, এমন নির্লজ্জতা, এমন দায়িত্বহীনতা নিয়ে কি একটি সমাজ টিকতে পারে?


গত দুমাসে বহুবার ওই দুই ধর্ষকের মুখোমুখি হয়েছি। নতুন উদ্যমে বাজার চষে সদলবলে আবার তারা রংবাজি শুরু করেছে।  অত্যন্ত ঘৃণাভরে এড়িয়ে চলেছি। 

আচ্ছা, তাদের যৌন লালসার তৃপ্তি ঘটাতে ওই মেয়েকে যখন তারা ডেকে পাঠাতো, তখন মেয়েটার কি মানসিক অনুভূতি হতো? দুটি ছেলে একজনের পর আরেকজন যখন একইস্থানে, একই সময়ে মেয়েটিকে ধর্ষণ করতো, মেয়েটির চোখ বেয়ে কি তখন জল পড়তো না? প্রতিবার ধর্ষিত হয়ে আসার পর আবার কখন ডাক পড়বে, এই ভয়ে কি মেয়েটি নির্ঘুম রাত কাটাতো না?

যারা বিভিন্নভাবে এই ধর্ষকদের পক্ষ নিয়েছেন, নীরবে, পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে তাদের সহযোগিতা করেছেন, এমনকি যাদের আশ্রয়প্রশ্রয়ে গণধর্ষণ মামলার জামিনে থাকা আসামী হয়েও তারা বুক ফুলিয়ে বাজারেঘাটে ঘুড়ে বেড়ানোর মতো লজ্জাহীন ও দুঃসাহসিক কাজ করে যাচ্ছে; তারা কি ভাবছেন? আপনাদের উপর অভিশাপ পড়বে না? অবশ্যই পড়বে। ওই ছোট্ট মা'মনির প্রতিক্ষণের মানসিক যন্ত্রণা, প্রতি ফোঁটা চোখের জল, প্রতিটি নির্ঘুম রাতের দীর্ঘশ্বাস অচিরেই বিষধর সাপের মতো দিনরাত আপনাদের বিদ্ধ করবে। এই সমাজে নৈরাজ্য তৈরি করার অধিকার সৃষ্টিকর্তা কাউকে দেননি।


> নষ্ট সমাজ

> প্রবাল ভৌমিক 

> ০৯ জুলাই ২০২০

Post Comment